বুদ্ধিজীবীহীন হয়ে পড়ছে বিএনপি -চাঁপাই প্রতিদিন২৪
বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ৮৭ বছর বয়সে আজ মা’রা গেলেন। বিএনপির নীতিনির্ধারণী মিটিংয়ে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন নিস্ক্রিয়। এক কথায় বিএনপি তাকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিলো। এনিয়ে ড. এমাজউদ্দীন আহমদেরও ছিলো অনেক অভিমান।
জাতীয় প্রেসক্লাবে জামাতের বিরুদ্ধে একবার কথা বলেছিলেন বিএনপিপন্থী এই শীর্ষ বুদ্ধিজীবী। এরপর জামাত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, এমাজউদ্দীন সাহেবরা কোন উদ্দেশ্যে কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এ ধরনের আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
ঘটনার রেশ নতুন মাত্রা লাভ করে একদিন পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর। তিনি বলেছিলেন, ‘এমাজউদ্দীন সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা কোনও দলীয় সিদ্ধান্ত নয়। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, মির্জা ফখরুল খালেদা জিয়ার পরামর্শেই এই মন্তব্য করেছেন।
মির্জা ফখরুলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার পর বিএনপির যাবতীয় অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন ড. এমাজউদ্দীন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই ঘটনার পর বিএনপির কোনও অনুষ্ঠানে বা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেননি ড. এমাজউদ্দীন। ড. এমাজউদ্দীনের পরিবারের একজন বলেছেন, ‘মতামত গ্রহণ না করা হলে কেন যাবেন তিনি।
এত বয়ো:বৃদ্ধ একজন মানুষের খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে রাত সাড়ে ৯ টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। এরপর ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফিরতে রাত ১১টা বেজে যায়। এভাবে কতদিন। তাই উনি যেতেন না। তাছাড়া খালেদা জিয়া জেলে গেলে তো তার কথা শোনার আর লোকই ছিলো না।’
ড. এমাজউদ্দীনের ভাষ্য ছিলো দলের কোনও স্তরে গণতন্ত্র চর্চা নেই। তৃণমূলে কমিটি হচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাহী কমিটি গঠনে মানা হয়নি জ্যেষ্ঠতা। দলে কোনও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নেই। ড. এমাজউদ্দীন ছাড়াও বিএনপির অবহেলা-অবমূল্যায়ন এবং পরামর্শ-মতামত গ্রহণে অনীহাসহ নানা কারণে দিন দিন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন দলটির সমর্থক জ্যেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক ও পেশাজীবীরা।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের সু- সম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে তাদের আর কেউ খোঁজ নেয়নি। যদিও খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগ থেকেই তাদের সঙ্গে দলের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। জানা যায়, তারেক জিয়ার একক নেতৃত্বের সমালোচনা করায় বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথা মানছে না দলটির শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ।
দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, বিএনপির রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বিভিন্ন সময় কাজ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, আমার দেশের মাহমুদুর রহমান, ড. শফিক রেহমান, ফরহাদ মজহার, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য আ ফ ম ইউসূফ হায়দার, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, কবি আব্দুল হাই সিকদারসহ সহ প্রায় সবাই নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।
এর মধ্যে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ আজ মারা গেলেন। এর আগে মারা গিয়েছেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মুক্তি পেলেও রাজনৈতিক কোনও কর্মকাণ্ডে নেই। ফরহাদ মাযহারও নানা কেলেঙ্কারিতে এখন নিজেই গুম হয়ে আছেন। শওকত মাহমুদ অসুস্থ ছিলেন। কিছুটা সুস্থ হলেও তাকে কোন মিটিংয়ে ডাকা হয় না।
ড. শফিক রেহমান জামিন পেয়ে লন্ডনে আছেন। এছাড়া অন্য যারা আছেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই নিজস্ব কর্মকাণ্ড নিয়েই ব্যস্ত। এদের মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রকাশ্যেই লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়ার নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তারেক জিয়ার নেতৃত্বে সমালোচনা করে এর আগে তিনি অনেকবার বলেছেন, লন্ডনে বসে দল চালানো সম্ভব নয়।
ছোট ছোট করে চুল কাটলেই জিয়াউর রহমান হওয়া যায় না। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সম্পর্কেও তিনি অনেক সময় অনেক মন্তব্য করেছেন। এসব কারণেই তার কোন পরামর্শই আমলে নেয় না বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, দলটিকে নানা সময় পরামর্শ দিতেন কয়েকজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী, আইনজীবী, অধ্যাপক, ও আইনবিদ।
নানা সময়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বা ভিন্ন কোনও উপায়ে দলের বিষয়ে পরামর্শ ও সুপারিশ তার হাতে তুলে দিতেন লিখিতভাবে। এই প্রক্রিয়াটিও বিএনপি প্রধানের পরামর্শেই তারা শুরু করেছিলেন। যদিও একটি অদৃশ্য শক্তির হস্তক্ষেপে তাদের প্রস্তাবগুলো হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো স্থগিত করা হয়েছে।
ক্ষেত্র বিশেষে প্রস্তাবগুলোকে সুকৌশলে দলীয় প্রধানের কার্যালয় থেকে সরিয়ে ফেলা হতো। এটি দল ও বুদ্ধিজীবীদের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার আরো একটি কারণ। জানা গেছে, বুদ্ধিজীবীদের দেওয়া পরামর্শ ও মতামত গ্রহণে বিএনপির ধারাবাহিক নেতিবাচক আচরণ ও উপেক্ষার কারণে দলটির সিনিয়র বুদ্ধিজীবী নিজেদের সরিয়ে রাখেন।
তাছাড়া দলের অনেক সিনিয়র নেতা এসব বুদ্ধিজীবীদের দাম দিতে চান না। তাদের যতটা সম্ভব দলে কর্তৃত্ব খর্ব করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাই বলছেন, বিএনপি কখনোই ভালোটি গ্রহণ করেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথা আমলে নেয়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে তারেক জিয়া ও তার নেতৃত্ব নিয়ে কথা বললে তা কখনো আমলে নেয় না বিএনপির একটি অংশের নেতারা। কেননা এ দলের নেতৃত্ব এখন তারেক জিয়ার হাতে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দলে কর্তৃত্ব খাটাচ্ছেন। ফলে নেতাকর্মীরা পদ-পদবী হারানোর ভয়ে নতজানু হয়ে আছেন।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার কাজের কৌশল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে রাত-দিন তফাৎ। শুধু তাই নয়, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের যোগদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীরা পরামর্শ দেন।
সে পরামর্শের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র তারেক জিয়ার একক সিদ্ধান্তে দলের নির্বাচিতরা সংসদে যোগ দেন। যা কোনোভাবেই কাম্য ছিলো না। অবশ্য বিএনপির অনেক নেতা বলছেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের কিছু অভিমান আছে। তবে ক্ষুব্ধ হয়ে দল থেকে দূরে সরবেন না।

কোন মন্তব্য নেই