ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ঘাতকরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি জেলখানার অভ্যন্তরে ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর মাত্র চারদিন পর সাতই নভেম্বর থেকে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যাকান্ড।
১৯৭৫ সালের এদিনে তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের নামে প্রথমে হত্যা করা হয় তিন খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধাকে। এরা হলেন- খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম, কে এন হুদা বীরউত্তম এবংএ টি এম হায়দার বীরবিক্রম। দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে অবস্থানকালে সকালে তাদের একেবারে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে দুজন কোম্পনি কমান্ডার। তারা হলেন আসাদ এবং জলিল।
বিগ্রেডিয়ার শাখাওয়াত বলেন, হামিদা নামের লেডি ডাক্তার ও একজন ডেন্টাল সার্জন করিমকে সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত আক্রোশে হত্যা করা হয়। ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও লে. মোস্তাফিজ, যারা বাংলাদেশ হকি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল তাদের তাড়া দিয়ে টিভি স্টেশনের পাশে নিয়ে হত্যা করা হয়।
এভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী অফিসার ও সৈনিকদের তালিকা করে ধরে ধরে হত্যা করা হয়। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস বলেছেন, সেই সময়ে সেনাবাহিনীর অফিসার সংখ্যা ৩০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল। তথাকথিত সিপাহী বিপ্লব হয়ে উঠে এক হত্যা উৎসব। এ হত্যা উৎসব পূর্ণতা পেয়েছিল কর্ণেল তাহের কে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানোর মধ্য দিয়ে।
তারও আগের ঘটনা। ১৭৫ সালের ৬ নভেম্বর ভোর রাতে গৃহবন্দী জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে যায় বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল ফারুকের ল্যান্সার বাহিনীর একটি দল। তারা জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসে কর্নেল রশিদের দুই নম্বর অ্যার্টিলারি রেজিমেন্টের দপ্তরে।
গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে বলেছেন, মুক্তি পেয়েই জিয়াউর রহমান সদ্যনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাস্মদ সায়েমের অনুমতি ব্যতিরেকে বেতারে ভাষণ দিতে চলে যান। ’৭১-এর ২৭ মার্চের মতোই সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দাবি করেন। পরে অবশ্য পদবী বদলিয়ে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০টিরও অধিক সামরিক অভ্যুত্থানের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর শত শত সৈনিককে হত্যা করে গনকবর দেওয়া হয়। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমানবাহিনীর অভ্যুত্থানটি করেছিলেন মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা থাকেন। মার্কাস ফ্র্যান্ডার মতে, এই অভ্যুত্থানের কারণে আড়াই হাজার সেনা সদস্য নিহত হয়।
আল্টিমেটলি সাত নভেম্বর হলো স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। ১৫ আগস্টের ফিনিশিং টাচ। যার পুরোটার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়া, এ ব্যাপারে জনাব হায়দার আলী খান রনোর লেখাটা প্রণিধানযোগ্য।
অভ্যুত্থানকারীরা যখন নানা ধরনের বিপ্লবী স্লোগান দিচ্ছিল তখন একদল লোক খন্দকার মোশতাকের ছবি নিয়ে বের হয়েছিল। এতদ্রুত মোশতাকের ছবি এলো কোথা থেকে? তাহলে কি আগের রাতেই মোশতাকের ছবি ছাপানো ও সরবরাহ করার ব্যবস্থা হয়েছিল? এর মানে তৎপর ছিল আরো অনেকেই?
সেনাবাহিনীতে তৎপর ছিল স্বার্থান্বেষী অফিসার এবং বে-সামরিক পর্যায়ে ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদী চরম প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীসমুহ। ছিল জামায়াতসহ পাকিস্থানপন্থী নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী। পরে তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত জিয়াউর রহমানের সাথে একাকার হয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবাযন করতে থাকে।
লেখক- আহমেদ কৌশিক, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

কোন মন্তব্য নেই